ত্রিপুরা ফোকাস

No result ..

লড়াই শেষ, পুণ্যদা আর নেই

মিলন চট্টোপাধ্যায়

লড়াই শেষ, পুণ্যদা আর নেই

১৫ই অক্টোবর ২০১৭, রাত ৮ টা ২৫ মিনিটে খবর এল হাসপাতাল থেকে। আরেক প্রিয় মানুষ শেখর কর যখন জানালেন- 'লড়াই শেষ' ঠিক তক্ষুনি হূহূ করে উঠল হাওয়া। ফাঁকা হয়ে গেল চারপাশ। পুণ্যশ্লোক দাশগুপ্ত আর নেই। কয়েকদিন ধরেই ভুগছিলেন রঘু'দা। শেষবার দেখা এন আর এস হাসপাতালে কয়েকমাস আগে। বাইরে তখন প্রচণ্ড বৃষ্টি। আমি আর শমীক কথা বললাম। বকাবকিও করলাম। রঘুদা বললেন - "এবার তোমার জন্য সিরিজ লিখব। তুমি ধূপগুড়ি এস আবার। মা দেখতে চাইছেন। আমি তোমাকে নিয়ে যাব ভুটান পাহাড়ে।'' বললাম - 'এই শীতেই যাব দাদা। অনেকগুলো নতুন রান্না শিখেছি। রান্না করব আর খুব ঘুরবো। কবিতা হবে, আড্ডা হবে।' রঘুদা শিশুর মত খুশি হয়ে উঠলেন।

 

সেই শেষ। আমার আর ভুটান পাহাড় দেখা হবে না রঘু'দা। কে আমাকে শোনাবে - চিলাপাতার জঙ্গলগাথা! প্রায় সাত বছরের সম্পর্ক। ২০১৩ অথবা ১৪ তে ইন্দ্রনীল তেওয়ারি, পার্থ প্রতিম রায় আর আমি প্ল্যান করলাম দার্জিলিং যাব। ফেরার সময় যাওয়া হবে ধূপগুড়ি। পুণ্যশ্লোক দাশগুপ্তের বাড়ি। সেইমত ফেরার পথে বিকেলে নামলাম ধূপগুড়ি। সেখানে এক ডাকবাংলোর পাশের রাস্তা দিয়ে চির তরুণের বাড়ি যাওয়া যায়। নামতেই দেখি একটু ঝুঁকে, একমুখ হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন ৭০ এর বিখ্যাত কবি পুণ্যশ্লোক দাশগুপ্ত। হাত ধরে বললেন- 'এসো। কতক্ষন অপেক্ষায় আছি।' যার কবিতা একসময় মুগ্ধ হয়ে পড়েছি তিনি স্বয়ং অপেক্ষায়! ডাকবাংলোয় থাকতে বলা সত্ত্বেও আমরা চলে এলাম পুণ্য'দার ঘরে। দোতালা ঘরে আমাদের জন্য সবটুকু ভালোবাসা, স্নেহ গুছিয়ে রেখেছেন পুণ্যশ্লোক দাশগুপ্ত, আমাদের রঘু'দা। ঘরে ওঠানামার দুটি সিঁড়ি যার একটি নেমে গেছে রাস্তায়।

সেখানেই রাতে আমি বানালাম খিচুড়ি আর ডিমের অমলেট। টেবল ল্যাম্পের আলোয় খেতে খেতে প্রচুর আড্ডা। সারারাতের অনেকটাই কবিতা শুনে, কবিতা পড়ে কেটে গেল। শেষরাতে ইন্দ্রনীল রাস্তায় নামার সিঁড়ি দিয়ে কোথায় যে গেল। পরে সেই সিঁড়িতেও কত মজা করলাম। পরদিন ঘুরতে গেলাম দলবেঁধে। জয়ন্তী বলে একটি মেয়েও এল। দেখা করতে এলেন সুবীর'দা। সুবীর সরকার। তারপর ষ্টেশনে হাঁটতে যাওয়া। পার্থ সেদিন জরুরী কোনো কাজে সন্ধ্যায় ধূপগুড়ি থেকেই ট্রেন ধরল। আমি আর ইন্দ্র পরদিন গেলাম জলপাইগুড়ি। সেখানে সপ্তাশ্ব ভৌমিক, নিলাদ্রী বাগচি, শেখর কর, বেনু দত্তরায় সকলের সঙ্গে আরও আড্ডা হল। রঘুদাকে এঁরা যে কত ভালোবাসেন সেটাও বুঝতে পারলাম।

ক্ষেপচুরিয়াস বলে আমরা একটা ম্যাগাজিন করতাম, এখনও বের হয়। পুন্যদাকে সেখানে সভাপতি করে আমরা একসময় দাপিয়ে বেড়িয়েছি। সেখানেও দেখেছি পুণ্যশ্লোক দাশগুপ্ত মানুষটা কত অন্যরকম। জুবিনের নামে ঝিলের নাম দিয়েছিলেন রঘুদা; সেইজন্য আমি বলেছিলাম -'আমার নামে দেবে না?' যখন ধূপগুড়ি গেলাম দেখি ঠিক মনে রেখেছেন। একটি ঝিলের নাম দিলেন -'মিলন ঝিল'। কোনদিন কারো নামে একটিও খারাপ উক্তি করতে দেখিনি রঘুদাকে। বাংলায় 'মিস্টিক' কবিতায় পুণ্যশ্লোক দাশগুপ্ত অপ্রতিদ্বন্দ্বী। বিদেশে হলে হয়ত তাঁকে নিয়েই থিসিস করতেন সাহিত্যের ছাত্ররা। তাঁর কবিতায় যে ঐন্দ্রজালিক সম্মোহন তা লিখে বোঝানো মুশকিল। তাঁকে বুঝতে গেলে বারংবার পড়া প্রয়োজন। যদিও তাঁর কবিতার আলোচনা করার জন্য এ লেখা একদমই নয়। এই মুহূর্তে মনের অবস্থাও তেমন নয়। কবিতার জগতের নোংরামির মধ্যে পুণ্যশ্লোক দাশগুপ্ত এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। কবি হিসেবে তিনি বাংলাভাষার অন্যতম কবি, কিন্তু মানুষ হিসেবে তাঁর থেকে ভালো মানুষ আমি অন্তত কম দেখছি। খুব কম। তিনি ছিলেন আমার আত্মার আত্মীয়। চিলাপাতার জঙ্গল থেকে একান্নটি ঐরাবত তাঁকে পাহারা দিয়ে নিয়ে গেছে অপার্থিব বসন্তের দেশে। যতদিন বেঁচে থাকব, আমার বুকের ভেতর থেকে যাবেন চিরকালীন পুণ্য - শ্লোক হয়ে। মুখে অমলিন হাসি আর হৃদয়ে অকৃপণ ভালোবাসা নিয়ে।

  ত্রিপুরা ফোকাস  । © সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ত্রিপুরা ফোকাস ২০১০ - ২০১৭

সম্পাদক : শঙ্খ সেনগুপ্ত । প্রকাশক : রুমা সেনগুপ্ত

ক্যান্টনমেন্ট রোড, পশ্চিম ভাটি অভয়নগর, আগরতলা- ৭৯৯০০১, ত্রিপুরা, ইন্ডিয়া ।
ফোন: ০৩৮১-২৩২-৩৫৬৮ / ৯৪৩৬৯৯৩৫৬৮, ৯৪৩৬৫৮৩৯৭১ । ই-মেইল : This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.